লেখক: আতাউর রহমান খান
সেনাবাহিনীর ভেতরে যে বিভাজন ও অবিশ্বাসের পরিবেশ ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে, তা দেশের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। সেনাবাহিনীতে যা ঘটছে, সেটি নিছক অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা নয়—এর বিস্ফোরণ ঘটলে প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে, যেমনটি আমরা পঁচাত্তরের দুঃসময়ে দেখেছিলাম।
সেনাবাহিনীর সদস্যদের, বিশেষ করে অফিসারদের, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা কখনোই যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ, চাকরিরত অফিসাররা কঠোর সামরিক আইন ও শৃঙ্খলার আওতায় পরিচালিত হন। তাঁদের পেশাগত জীবন এতটাই নিয়ন্ত্রিত যে, একই দিনে কমিশনপ্রাপ্ত বা একই পদবীর দুই অফিসারের মধ্যে যার ব্যক্তিগত নম্বর আগে, তিনি সিনিয়র হিসেবে গণ্য হন। সেই সিনিয়রের আদেশ মান্য করা একজন জুনিয়রের জন্য বাধ্যতামূলক—এটাই সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলার মূলভিত্তি। এই শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে জুনিয়র অফিসারের চাকরি পর্যন্ত চলে যেতে পারে।
অতএব, চাকরিরত অবস্থায় কোনো অফিসার যদি ব্যক্তিগতভাবে গুরুতর অসামরিক অপরাধ—যেমন খুন, ধর্ষণ বা অন্য কোনো ফৌজদারি অপরাধ—করে থাকেন, তাহলে সেটি অবশ্যই বিচারের আওতায় আসা উচিত এবং আসে। এক্ষেত্রে চাকরিরত অফিসারদের অবশ্যই সেনা আইনে বিচার হতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্তদের বিচারও সেনা আইনে হতে পারে।
তবে কর্তব্য পালনের অংশ হিসেবে কোনো নির্দেশ পালন করতে গিয়ে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেটির বিচার করা তুলনামূলকভাবে জটিল। কারণ, সে ক্ষেত্রে উত্তর সাধারণত একটাই থাকে—
“আমি আমার আইন অনুযায়ী ঊর্ধ্বতনের নির্দেশ পালন করেছি।” এখানে যদি উর্ধতন কর্তৃপক্ষ কোনো আন ল-ফুল কমান্ড দেন তবুও তা অমান্য করা একজন অধস্থনের পক্ষে কঠিন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও অনেক আন-ল-ফুল কমান্ড করা হচ্ছে, চ্যানল ব্রেক করা হচ্ছে, কেউ প্রতিবাদ করতে পারছে না।
অতএব, যদি কোনো অফিসার কর্তব্য পালনের সময় তাঁর ঊর্ধ্বতনের নির্দেশ অনুসরণ করেন, তাহলে সেটিকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা অন্যায় ও অন্যায়ের শামিল। এমন পরিস্থিতিতে যদি জোর করে দণ্ড দেওয়া হয়, তবে তা কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, পুরো বাহিনীর মনোবল ও শৃঙ্খলাকে বিপন্ন করে তোলে।
দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় সেনাবাহিনীর ভেতরে চেইন অব কমান্ড বজায় রেখে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও পেশাদারিত্বের সম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। এই সম্পর্ক দুর্বল হলে সেটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও এক গভীর বিপদের ইঙ্গিত। এ ধারা অব্যাহত থাকলে এখন যারা চেইন অব কমান্ড ভঙ্গ করবেন, ভবিষ্যতে একদিন না একদিন তাদেরও জবাবদীহিতার আওতায় আসতে হবে এটা নিশ্চিত। অতীত অভিজ্ঞতা সেটাই বলে।








Leave a Reply